হবিগঞ্জে তন্নী হত্যাকান্ডের ঘাতক রানু গ্রেপ্তার

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের চাঞ্চল্যকর কলেজ ছাত্রী তন্নী রায় হত্যাকান্ডের ঘাতক প্রেমিক রানু রায়কে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ। গত শুক্রবার বিকাল ৫টায় ...

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের চাঞ্চল্যকর কলেজ ছাত্রী তন্নী রায় হত্যাকান্ডের ঘাতক প্রেমিক রানু রায়কে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ। গত শুক্রবার বিকাল ৫টায় বি-বাড়িয়া শহরের বাদুঘর বাসষ্ট্যান্ড থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গতকাল শনিবার বিজ্ঞ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে রানু রায় হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করে লোহর্ষক বর্ণনা দেয়। এদিকে ঘাতক প্রেমিক রানু গ্রেফতারের খবরে নবীগঞ্জে স্বতি ফিরে এসেছে। প্রেমের কারণেই প্রাণ দিতে হয়েছে কলেজ ছাত্রী তন্নীকে।
গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে রানু গ্রেফতার ও তার স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দির বর্ণনা দেন পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার ভদ্র। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আ.স.ম সামসুর রহমান ভুইয়া, সহকারি পুলিশ সুপার (সদর) সুদিপ্ত রায়, সহকারি পুলিশ সুপার সাজিদুর রহমান, ডিবি ওসি আজমিরুজ্জামান, এসআই আব্দুল করিম ও সুদ্বীপ রায়।
জানা যায়, নবীগঞ্জের বিমল রায়ের কন্যা কলেজ ছাত্রী তন্নী রায় হত্যাকান্ডে মামলা দায়ের করলে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় নবীগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) কামরুল হাসানকে। পরে মামলাটি ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়। তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় হবিগঞ্জ ডিবি’র ওসি কে এম আজমিরুজ্জামান। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ডিবি ওসি আজমিরুজ্জামান, এসআই আব্দুল করিম ও সুদ্বীপ রায় গত শুক্রবার বিকেল ৫ টার দিকে অভিযান চালিয়ে বি-বাড়িয়া শহরের বাদুঘর বাসষ্ট্যান্ড এলাকা থেকে রানু রায়কে গ্রেফতার করতে সক্ষম হন। পরে তাকে নিয়ে আসা হয় হবিগঞ্জ ডিবি কার্যালয়ে। গ্রেফতারকৃত রানু রায় রাতে জিজ্ঞাসাবাদে তন্নী রায়কে হত্যার দায় স্বীকার করে। এ সময় রানু ডিবি পুলিশের নিকট ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দেয়। গতকাল শনিবার দুপুরে ঘাতক রানু রায় হবিগঞ্জে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিশাত সুলতানার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি প্রদান করে। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রানু তার স্বীকারোক্তি জবানবন্দি দেয়।
ঘাতক প্রেমিক রানু রায় আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে জানায়, মেধাবী কলেজ ছাত্রী তন্নী রায়ের বাসায় তারা ভাড়া থাকতো। সেই সুবাধে তন্নীর সাথে পরিচয় অতঃপর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। ভালবাসার সম্পর্ক গভীর পর্যায়ে গেলে তন্নীকে নিয়ে প্রেমিক রানু নানা স্থানে ঘুরে বেড়াতো। এরমধ্যে বাসা বদল করে রানু রায়ের পিতা তাদের নতুন বাসায় চলে আসে। ফলে প্রেমিকা তন্নীর সাথে দেখা সাক্ষাত কম হলেও যোগাযোগ হতো ফোনের মাধ্যমে। ইতিমধ্যে তন্নী অন্যান্য যুবকের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলতে থাকে। বিষয়টি রানু জানতে পারে। এনিয়ে তন্নীর সাথে ফোনে বাদানুবাদের সৃষ্টি হয়। কললিষ্টের তথ্য মতে ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বর তন্নী রায় ও রানু রায়ের মাঝে ফোনে ৪০ বার কথা হয়। এর বেশির ভাগ ফোন করে তন্নী। ১৭ সেপ্টেম্বর বেলা ১ টার দিকে তন্নী রায় প্রেমিক রানু রায়ের জয়নগরস্থ বাসায় যায়। এ সময় রানু পিতা কানু রায় বাসার বাহিরে। রানু মা তার কাকাতো বাইয়ের বিয়ের মেয়ে দেখার জন্য পাশ্ববর্তী সুজানগর যান। বোনও ছিলে বাসার বাহিরে। এ সুযোগে প্রেমিক রানু রায়ের শয়ন কক্ষে বসে তন্নী ও রানু বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনায় বসে। এ সময় অন্য ছেলেদের সাথে তন্নীর প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে উভয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। এ পর্যায়ে তন্নী প্রেমিক রানুর গালে স্বজুড়ে থাপ্পর মারে। এতে তন্নীর প্রতি ক্ষেপে উঠে রানু। এ সময় রানু প্রেমিকা তন্নীকে উপর চড়াও হয়ে সজোরে গলা চেপে ধরে। কিছুক্ষণের মধ্যে তন্নীর শরীর নিস্তেজ হয়ে যায়। রানু দেখতে পায় তন্নীর নড়াচড়া নেই। তখন রানু খুব ভয় পায়। এক পর্যায়ে রানু ঘরে থাকা বস্তায় তন্নীর লাশ ভরে ডিসের তার দিয়ে বস্তার মুখ বেধে রাখে। ভাবতে থাকে কি করবে। এক সময় সন্ধ্যা হয়ে আসলে রানু বস্তাবন্দি লাশটি পার্শ্ববর্তী নির্মানাধিন একটি ভবনে লুকিয়ে রাখে। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে রাত ২ টার দিকে রানু ঘর থেকে বের হয়ে টেনে টেনে বরাক নদীর পাড়ে নিয়ে যায়। রানু জানায়, একা সে লাশটি নিয়ে যেতে পারছিল না। অনেক কষ্ট করে সে বস্তাবন্দি লাশটি টেনে টেনে নদীর পাড়ে নিয়ে যায়। পরে নির্মানাধিন ভবন থেকে কয়েকটি ইট নিয়ে বস্তার ভেতর দিয়ে বস্তাটি বরাক নদীতে ফেলে দেয়। ঘটনার পর রানু এলাকাতেই অবস্থান করছিল। কিন্তু তন্নীকে যখন খোজাখুজি শুরু হয় এবং তাদের বাড়িতেও তন্নীর খোজে তার পিতা-মাতা আসতে থাকে তখন সে পালিয়ে ঢাকা চলে যায়। বন্ধ করে করে দেয় তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি।
২০ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫ টার দিকে বরাক নদীতে তন্নীর বস্তাবন্দি লাশ ভেসে উঠে। লাশ বিকৃত হয়ে যাওয়ায় কেউ লাশ সনাক্ত করতে পারেনি। পরে লাশের সাথে পাওয়া একটি চাবি দিয়ে তন্নীর সুকেজের তালা খুলার পর নিশ্চিত হয় উদ্ধারকৃত লাশটি তন্নীর। এর পর থেকে হত্যাকারীদের খুজে মাঠে নামে পুলিশ। সন্দেহের ছুটে যায় প্রেমিক রানু রায়ের দিকে। ইতিমধ্যে রানু পিতা কানু রায় সহ পরিবারের সবাই বাসায় তালা ঝুলিয়ে আত্মগোপন করে। পুলিশ ঘরের তালা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত বস্তা ও ডিসের তার জব্দ করে। একই রকম বস্তা ও ডিসের তার তন্নীর লাশের সাথে পাওয়া যায়।
এদিকে রানু পালিয়ে যায় ঢাকায়। সেখানে ফুটপাতে কাজ করতো। পুলিশের ভয়ে বন্ধ করে দেয় নিজের ব্যবহৃত মোবাইল। তার বাবা কানু রায়ও তার মোবাইলটি বন্ধ রাখে। প্রয়োজনে অন করে কথা বলতো। ফলে রানু রায় বা পরিবারের কারো সাথে তার যোগাযোগ ছিলনা। রানু প্রয়োজনে দোকান থেকে তার নিকট থাকা লিষ্ট থেকে নাম্বার বের করে ফোন করতো। ২/৩ দিন পূর্বে রানু তার পিতার নম্বরে ফোন দেয়। এ সময় ভাগ্যক্রমে পেয়ে যায় পিতাকে। কতা হয় তাদের। এ সময় রানু জানতে পারে পরিবারের সবাই পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এ রানু মনে দাগ কাটে। তার কারণে পরিবারের সবাই কষ্ট করছে। এতে সে স্থির করে আত্মসমর্পন করবে। এদিকে পুলিশ রানু তার তার পরিবারের সদস্যদের গ্রেফতারে সর্বত্র জাল বিস্তার করে। এরই মধ্যে শুক্রবার হবিগঞ্জ ডিবি পুলিশের নিকট খবর আসে রানু বি-বাড়িয়া শহরের বাদুঘর বাসষ্ট্যান্ড এলাকায় রয়েছে। হবিগঞ্জ ডিবি ওসি আজমিরুজ্জামান, এসআই আব্দুল করিম ও সুদ্বীপ রায় সেখানে অবস্থান নেন। এক পর্যায়ে বিকেল ৪ টার দিকে রানু ওই এলাকায় আসলে পুলিশ তাকে আটক করতে সক্ষম হয়।
উল্লেখ্য, নবীগঞ্জের মেধাবী কলেজ ছাত্রী তন্নী রায় গেল ১৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে আইসিটি সেন্টারে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি। রানু রায়ের বাসা সহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুজি করেও তন্নীর কোন সন্ধান না পেয়ে রাতেই নবীগঞ্জ থানায় ডায়েরী করেন তন্নীর পিতা বিমল রায়। এর ৩ দিন পর ২০ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫ টার দিকে স্থানীয় বরাক নদী থেকে বস্তাবন্দি ভাসমান অবস্থায় তন্নীর লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের তদন্তে প্রাথমিক ভাবে ধারনা করা হয়েছিল একাধিক প্রেমের কারণে বলি হয়েছে তন্নী রায়। দু’ভাই বোনের মধ্যে তন্নী রায় ছোট। কিন্ত কেই বা জানতো প্রেম প্রেম খেলার খেসারত এভাবে মুল্য দিতে হবে তন্নীর। ঘাতক রানুর নবীগঞ্জে সর্বশেষ অবস্থান ছিল নবীগঞ্জ পৌর এলাকার চরগাঁও এয়ারটেল টাওয়ারের আওতায়। আর তার পিতা কানু রায়’র মোবাইল ট্র্যাকিং এ জানা গেছে, কানু রায় সর্বশেষ ২১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অবস্থান করছিল। পরবর্তীতে মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় পুলিশ তাদের হদিস পাচ্ছিলো না।
এক দিকে তন্নী হত্যাকান্ড নিয়ে জনমনে যেমন দেখা দিয়েছে চাপা ক্ষোভ অন্য দিকে নিহতের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। তন্নীর পরিবার রয়েছেন চরম হতাশায়। অন্য দিকে এ ঘটনায় আতংকের মধ্যে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা।
তন্নীর পিতা বিমল রায়ের বাড়ি উপজেলার করগাঁও ইউনিয়নের পাঞ্জারাই গ্রামে। ব্যবসা করার সুবাধে দীর্ঘদিন ধরে নবীগঞ্জ শহরে বসবাস। এক খন্ড ভূমি কিনে ঘর নির্মাণ করে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন পৌর শহরের শ্যামলী (ধান সিড়ি) আবাসিক এলাকায়। বিমল রায় বর্তমানে ইভা ফার্নিচার এর ম্যানাজার হিসেবে কর্মরত। রানুর বাবা কানু রায়ের মুল বাড়ি বানিয়াচং উপজেলার পুকড়া গ্রামে। সে শহরে সবজি ব্যবসা করে। ওই বাসায় ভাড়া নেয়ার আগে উপজেলার আদিত্যপুর, দত্তগ্রাম এবং শহরের ডাক বাংলো সড়কে ভাড়ায় বসবাস করতেন। পরে বিমল রায়ের বাসায় ভাড়াটে হিসেবে জায়গা নেন। প্রায় মাস দেড়েক আগে জয়নগর এলাকায় নতুন বাড়িতে গিয়ে উঠেন কানু রায়।
তন্নী হত্যার ঘটনার বিচার চায় নবীগঞ্জবাসী। তন্নীর ঘাতক প্রেমিক রানু রায় গ্রেফতারের খবরে শহরে স্বস্তি ফিরে আসে নবীগঞ্জবাসী মাঝে। তারা ঘাতক রানুর ফাঁসির দাবী জানান।

COMMENTS

Name

chatiyain dharmaghor Jatio আদাঐর আন্দিউড়া আমাদের সমস্যা খেলাধুলা চৌমুহনী জগদীশপুর জাতীয় নয়াপাড়া বহরা বাঘাসুরা বিনোদন বুল্লা ব্যবসা-বানিজ্য মাধবপুর উপজেলা রূপচর্চা শাহজাহানপুর শিক্ষা সারাবিশ্ব স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
false
ltr
item
News9: হবিগঞ্জে তন্নী হত্যাকান্ডের ঘাতক রানু গ্রেপ্তার
হবিগঞ্জে তন্নী হত্যাকান্ডের ঘাতক রানু গ্রেপ্তার
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEg4oASCFNDCGp2B6J2k_TwZCsMYHh5t4Ai7j47fWcwAu6GZX5qH0rccBjTMYHoY_6xuZNy2d1fxU5QcojbsZIAFMz807ZPKwKiMd_8WyTOEK-Tli6E9MwA-_OlsVG_VDBmIZu0tWPZuZTQb/s640/PIC-NABIGANJ-TONNI1-225x300_1_1.jpg
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEg4oASCFNDCGp2B6J2k_TwZCsMYHh5t4Ai7j47fWcwAu6GZX5qH0rccBjTMYHoY_6xuZNy2d1fxU5QcojbsZIAFMz807ZPKwKiMd_8WyTOEK-Tli6E9MwA-_OlsVG_VDBmIZu0tWPZuZTQb/s72-c/PIC-NABIGANJ-TONNI1-225x300_1_1.jpg
News9
https://news9-rakibs.blogspot.com/2016/10/blog-post_8.html
https://news9-rakibs.blogspot.com/
http://news9-rakibs.blogspot.com/
http://news9-rakibs.blogspot.com/2016/10/blog-post_8.html
true
4718368484096141909
UTF-8
Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy